দলব’দ্ধ যৌ,নতা সম্প’র্ক তাজা রাখে : তসলিমা নাসরিন

মানুষ বিয়ে করে কেন? নির্বি’ঘ্ন ে যৌ*ন স’স্পর্ক করা’ সন্তান জ’ন্ম দেওয়া- এর জন্য বিয়ের তো দরকার নেই! মানুষ ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনও প্রা’ণীর মধ্যে বিয়ের কোনও রীতি নেই’

অথচ দিব্যি তারা একত্র বাস করছে’ সন্তান জ’ন্ম দিচ্ছে’ সন্তানকে খেটে খুটে বড় করছে। পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার জন্যও বিয়েটা জ’রুরি নয়। অনেক প্রা’ণী আছে যারা যৌ’বনের শুরুতে যে সঙ্গী বেছে নেয়’ সেই সঙ্গী নিয়েই দিব্যি সুখেশান্তিতে বাকি জী’বন কা’টিয়ে দেয়।

অন্য কারও জন্য লোভ করে না’ কাউকে নিয়ে আবার নতুন সংসার পাতার কোনও স্বপ্ন আর দেখে না। অবিশ্বা’স্য রকম বিশ্বস্ত’ একগামী। যত দূ’রেই যাক’ যত সমুদ্রই পেরোক’ যত বয়সই বাড়–ক’ ঘরে ফি’রে পুরনো সেই সঙ্গীকেই চুমু খায়’ তার বুকেই মাথাটা রাখে। পরকীয়া কাকে বলে’ বহুগামিতা কাকে বলে’ বিশ্বা’সঘা’তকতা কাকে বলে জানেই না।

অ্যালবাট্রোস’ রাজহাঁস’ কালো শকুন’ ন্যাড়া ঈগল’ টার্টল পায়রা’ ডিক-ডিক হরিণ’ বনেটমাথা হাঙ্গর’ গিবন’ ফ্রেঞ্চ এঞ্জে’লফিস’ ছাইরঙা নেকড়ে’ প্রেইরি ভোল- এদের কথা বলছি। মানুষ তো বিয়ে করে একস’ঙ্গে সুখেশান্তিতে সারা জী’বন কাটানোর জন্য কিন্তু ক’জন পারে’ শুনি? বেশির ভাগের বিয়েই হয় ভে’’ঙে যায় অথবা টিকে থাকলেও ভালোবাসাহীন টিকে থাকে।

টিকিয়ে রাখতে হয় সন্তানের অসুবিধে হবে বা অর্থনৈতিক মেরুদন্ড ভে’’ঙে যাবে বা লোকে কী বলবে ভ’য়ে। এভাবে টিকে থাকাকে ঠিক টিকে থাকা বলে না। ঘরে স্ত্রী রেখে বা স্বামী রেখে দিব্যি অন্য কারও স’ঙ্গে স’স্পর্ক গড়ছে মানুষ।

সেই স’স্পর্কও ভে’’ঙে যায়’ আবার নতুন স’স্পর্ক গড়ে ওঠে। মানুষ ন্যাড়া ঈগল নয় বা কালো শকুন নয়। একগামিতা মানুষের চরি’ত্রে নেই। মানুষ বহুগামী। মানুষ বহুগামী’ এও কিন্তু হলফ করে বলা যায় না। মানুষ আ’’সলে জটিল এবং বিচিত্র।

একগামী’ বহুগামী’ অসমকামী’ সমকামী’ উভকামী- মানুষ অনেক কিছুই। নতুন কিছুতে অভ্যস্ত হতে’ পুরনো স্বভাব পাল্টাতেও মানুষের জুড়ি নেই। প্রায় সব ধ’র্মই বিয়েকে পুরুষ আর নারীর ‘পবিত্র মি’লন’ বলে ঘো’ষণা করেছে। ঈশ্বরই নাকি আগে থেকে সঙ্গী নির্বাচন করে রাখেন। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আর যা কিছু ঘটুক’ বি’চ্ছেদ যেন না ঘ’টে’ ঈশ্বর সত’র্ক করে দিয়েছেন। তাতে কী!

প্রচ’ণ্ড ঈশ্বরভক্তরাও ঈশ্বরের এই উপদেশ আজকাল আর মানেন না। ঈশ্বরের নির্বাচিত সঙ্গীকে দিব্যি তালাক দিয়ে নিজে সঙ্গী নির্বাচন করেন। প্রায় সব ধ’র্মই বিয়েতে নাক গলিয়েছে। বয়স’ লি’ঙ্গ’ জাত’ বিশ্বা’স কী হওয়া চাই’ স্বামী-স্ত্রীর কর্তব্য এবং দায়িত্বই বা কী হওয়া উচিত- এ নিয়ে বিস্তর উপদেশ দিয়েছে’ ক’ঠোর ক’ঠোর নিয়মও তৈরি করেছে।

বিয়ে যদিও ব্য’’ক্তিগত ব্যাপার’ কিন্তু ধ’রে বেঁধে একে সামাজিক করে ফেলা হয়েছে। পুরুষদের না করা হলেও মেয়েদের করা হয়েছে সামাজিক সম্পত্তি। বিয়ের আগে মেয়েটা কারও স’ঙ্গে প্রেম করেছে কি না’ ঠিকঠাক কুমা’রী ছিল কি না’ বিয়ের পর স্বামী ছাড়া আর কারও স’ঙ্গে স’স্পর্ক গড়েছে কি না’ কার স’ঙ্গে বাড়ির বাইরে বেরোচ্ছে’ কখন ফিরছে’ বাইরের কোনও পুরুষ লোক বাড়িতে ঢুকেছে কি না’ এসব শুধু বাড়ির নয়’ বাড়ির বাইরের লোকও লক্ষ রাখছে। সমাজে’’র দশটা লোক দেখছে বলেই পান থেকে চুন খসলে মেয়েদের নিয়ে সমাজে মুখ দেখাতে পারে না বাবারা’ ভাইয়েরা’ কাকারা।

মেয়েদের খু’ন করে পরিবারের ‘সম্মান’ র’ক্ষা করে। পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বিয়ে প্রায় উঠে যাচ্ছে। কিছু লোক অবশ্য করছে বিয়ে! এভারেস্টটা আছে বলে যেমন অনেকে এভারেস্টে চড়ে’ বিয়েটা আছে বলেই অনেকে বিয়েটা করে। বিয়ের চল চলে গেলে আর করবে না। যে প্রথা চলছে’ অধিকাংশ লোক সেই প্রথাকেই চালিয়ে নিয়ে যায়।

আর’ যার প্রচলন নেই’ তাকে চালু ক’রতে খুব অল্প ক’জনই উদ্যো’’গ নেয়। অনেক প্রেমিক-প্রেমিকা বিয়ে না করেও দিব্যি সংসার করছে বছরের পর বছর। বিয়ে না করেই সন্তান জ’ন্ম দিচ্ছে। বিয়ের পিতৃতান্ত্রিক চরি’ত্র নিয়ে বিস্তর হাসিঠাট্টা করছে। বিয়েটা যুক্তিহীন’ কিন্তু টিকে আছে। কুসংস্কার যেমন হাজার বছর ধ’রে বেঁ’চে থাকে! তবে ওরা ধীরে ধীরে বিলুপ্তও হয়ে যায় বটে। বিয়েরও বিলুপ্তি ঘটবে। উত্তর ইউরোপের দেশগুলোয় বিয়ে করার পেছনে গো’পন একটি কারণও অবশ্য আছে’ বিয়ে করলে ট্যাক্স কম দিতে হয়’ সন্তানাদি পোষার খরচ সব রাষ্ট্রই দেয়।

মানুষ বিয়ে করছে না’ বাচ্চাকাচ্চাতেও খুব একটা কারওর উৎসাহ নেই’ বিয়ের প্রথাটি ভে’’ঙে গেলে সন্তান উৎপাদন যে হারে কমছে’ সেটি আরও কমে যাবে’ উত্তর ইউরোপীয়দের অস্বিত্বই ভবিষ্যতে থাকবে না’ এই ভ’য়ে বিয়েতে উৎসাহ দিতে জনগণের নাকের ডগায় ট্যাক্স কমানোর মুলো ঝুলিয়েছে সরকার। সুযোগ-সুবিধের আশায় বিয়ে করছে বটে কিছু লোক’ তবে বেশির ভাগ লোকই হয় একা থাকে’ নয়তো বিনে-বিয়ে’য় একত্র বাস করে।

ষাট দশকের শে’ষ দিকে সমাজে’’র বা’ধানি’ষেধ উপেক্ষা করে ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ বেরিয়ে এসেছিল পুরনো রাজনীতি আর পুরনো সমাজব্যব’স্থা আমূল পাল্টে ফেলতে। ভালো মেয়ে হতে হলে কৌমা’র্য’ সতীত্ব’ মাতৃত্ব ইত্যাদি বজায় রাখতে হয়- পুরনো এই ধারণাটির গায়েও কুড়োল বসিয়েছিল। রীতিমতো বিয়ে করাই ব’’ন্ধ করে দিয়েছিল সেদিনকার হিপিরা।

অনেকে একবাড়িতে বাস করতো’ সবার স’ঙ্গে সবারই সে’ক্স হতো’ বাচ্চাকাচ্চা হলে সবাই মিলে দেখাশোনা করতো। সেই ‘কমিউন’ জী’বন বেশি বছর টেকেনি। হিপিরা জয়ী হলে আজ বিয়েটা ইতিহাসের পাতায় স্থান পেতো’ সমাজে নয়। অনেক কবি সাহিত্যিক দার্শনিক বিয়ে স’স্পর্কে মন্তব্য ক’রেছেন’ বিয়েটা যে অনর্থক একটা জিনিস’ তা বেশ কায়দা করে বুঝিয়েও দিয়েছেন।

‘নিজে’’র বিয়ের আর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় পার্থক্য একটাই’ বিয়ের ফুলগুলোর গন্ধ পেতে পারো’ আর অন্ত্যেষ্টির ফুলগুলোর পারো না’। অস্কার ওয়ার্ল্ড বলতেন’ ‘সব সময় প্রেম ভালোবাসায় ডুবে থাকা উচিত। সে কারণেই কখনও বিয়ে করা উচিত নয়।’ ক্যাথারিন হেপবার্ন সে আমলেও নারী পুরুষের এক বাড়িতে বাস করার পক্ষে ছিলেন না। বলেছিলেন’ ‘একটা নারী আর একটা পুরুষ পরস্পরের সব কিছু পছন্দ করছে?

যদি এরকম ঘ’টনা ঘ’টেই থাকে’ তবে সবচেয়ে ভালো হয় তারা যদি একই পাড়ায় থাকে’ মাঝে মাঝেই দেখা হবে!’ এও বলেছিলেন’ ‘একটা লোক অপছন্দ করবে বলে যদি অনেক পুরুষের প্রেমকে তুচ্ছ ক’রতে চাও’ তা হলে যাও’ গিয়ে বিয়ে করো।’ সুন্দর কিছু মন্তব্য ক’রেছেন ক’জন ব্য’ক্তিত্ব। ‘বিয়েটা চমৎকার আবিষ্কার’ ঠিক যেমন সাইকেল মেরামত করার যন্ত্রটাও চমৎকার আবিষ্কার।’

‘বিয়েটা একটা খাঁচা’ খাঁচার বাইরের লোকেরা খাঁচায় ঢোকার জন্য ব্যাকুল’ আর খাঁচার ভেতরের লোকেরা খাঁচা থেকে বেরোবার জন্য ব্যাকুল।’ ‘বিয়েটা শুধু তাদের জন্য ভালো’ যারা একা ঘুমোতে ভ’য় পায়।’ সব মন্তব্যই বিয়ের বিপক্ষে নয়। পক্ষেও কিছু মন্তব্য ক’রেছেন কেউ কেউ। যেমন’ ‘যদি এমন কোনও ধনকুবের পুরুষের দেখা পাই’ যে প্রতিজ্ঞা করবে তার সহায় সম্পত্তির অর্ধেকটা আমায় লিখে দেবে’ লিখে দিয়ে এক বছরের মধ্যে মরে যাবে’ তবে তাকে আমি নিশ্চয়ই বিয়ে করবো।’

অন্য আরও ক’জন বলেছেন’ ‘বিয়েটা চমৎকার ইনস্টিটিউশন। কিন্তু কে চায় ইনস্টিটিউশনে বাস ক’রতে?’ ‘প্রেমিকের স্নায়ুতন্ত্র পুরোটা উপ’ড়ে তুলে নিলে যেটা প’ড়ে থাকে’ সেটা স্বামী।’ ‘বিয়েটা ঘুষ’ যেন বাড়ির চাকরানি নিজেকে বাড়ির মালিক বলে মনে ক’রতে পারে।’ ফরাসি লেখক বালজাক বলেছিলেন’ ‘বেশির ভাগ স্বামী’কে দেখলেই আমা’র সেই ওরাংওটাংটির কথা মনে প’ড়ে’ যে খুব বেহালা বাজানোর চেষ্টা করছিল।’

পাশ্চাত্যে যখন হিপি বিপ্লব’ নারী স্বাধীন’তার আন্দোলন’ প্রাচ্যে তখনও মেয়েদের হাতে-পায়ে অদৃ’শ্য শেকল’ গো’পনাঙ্গে অদৃ’শ্য সতীত্বব’’ন্ধনী। বিয়েটা যে কারণে শুরু হয়েছিল’ প্রাচ্যের বেশির ভাগ পুরুষ এখনও সেই কারণেই বিয়ে করে। একটা জরায়ু দরকার’ যে জরায়ু একটা নির্দিষ্ট পুরুষের ঔরসজাত সন্তান ধারণ করবে। পিতৃত্বের নিশ্চয়তাই বিয়ের মূল উদ্দেশ্য।

পুরুষের স্বার্থে পুরুষকে বিয়ে করে পুরুষতান্ত্রিক ব্যব’স্থা হাজার বছর ধ’রে টিকিয়ে রাখছে মেয়েরা। মেয়েরা বেঁকে বসলে পুরুষতন্ত্রের বিরাট বেলুনটি সশব্দে চুপসে যেত কবেই! বাঙালি সমাজে দেখেছি’ বিয়ের পর মেয়েদের ডানাটা গোড়া থেকে কে’টে দেওয়া হয়।

নিজে’’র ঘরদোর-আত্মীয়স্বজন-ব’’ন্ধুবান্ধব-পরিবেশ-প্রতিবেশ-শহরবন্দর সব ছাড়তে হয় মেয়েদের। নিজে’’র নামের শে’ষে স্বামীর পদবি জুড়তে হয়। শ্বশুরবাড়িতে বাস ক’রতে হয়। মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলেও’ শিক্ষিত হলেও’ সে চাকরি করবে কি করবে না সেই সিদ্ধা’ন্ত স্বামী এবং স্বামীর আত্মীয়স্বজন নেয়। এক সময় তো প্রচলিত ছিলই’ এখনও অনেকে বলে যে’ ‘বিয়ের পর চাকরি করা চলবে না’।

সতী-সাবিত্রী থাকার জন্য ঘরে থাকাটা ভালো’ ঘরের কাজক’র্ম করবে’ বাড়ির সবার সেবা করবে’ সন্তান বড় করবে! গ্লোরিয়া স্টাইনেম একটা চমৎকার কথা বলেছিলেন’ ‘সে-ই স্বাধীন মেয়ে’ যে বিয়ের আগে যৌ*ন স’স্পর্ক করে’ আর বিয়ের পরে চাকরি।’ অধিকাংশ বাঙালি মেয়ে স্বাধীন’তার সঠিক অর্থই জানে না। কলকাতায় স্বামী-স্ত্রীর প্রেমহীন স’স্পর্ক দেখে আঁতকে উঠতাম মাঝে মাঝে।

প্রায়ই জিজ্ঞেস করতাম’ ‘বিয়েটা ভে’’ঙে যেতে চাইলে ভে’’ঙে যেতে দাও’ জো’র করে দাঁড় করিয়ে রাখছো কেন?’ ভালো কোনও উত্তর কখনও পেতাম না। অসুখী জী’বনে বহুদিন থাকতে থাকতে মেয়েরা অভ্যস্তও হয়ে যায়। যে সন্তানের জন্য বিয়ে না ভা’ঙা’ সেই সন্তান সংসারের অশান্তি দে’খতে দে’খতে বড় হয়। এমন সংসারে সন্তানের গড়ে ওঠায় লাভের চেয়ে ক্ষ’তিই বেশি। আ’’সলে’ মেয়েদের অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আর নি’রাপত্তা সমাজে না থাকলে একা বাস করা বা একা সন্তান মানুষ করা দুরূহ।

কিন্তু তাই বলে কি অত্যাচারী স্বামীর স’ঙ্গে আপস ক’রতে হবে! বধূ নি’র্যাতন আর বধূ হ’ত্যা যে হারে বাড়ছে’ তা দেখে গা শিউরে ওঠে। পুরুষতন্ত্রের বীভৎস নারীবিদ্বেষ আর নারীঘৃণা কী উৎকটভাবেই না প্র’কাশ পায়! যে সমাজে শিক্ষিত’ স্বনির্ভর’ সচে’তন মেয়ের সংখ্যা বেশি’ সেই সমাজে বি’চ্ছেদের সংখ্যাটা বেশি’ বিয়ের সংখ্যাটা কম।

ভারতীয় উপমহাদেশে অবশ্য উপার্জনহীন পরনির্ভর মেয়েদের মতো পুরুষতন্ত্রের মন্ত্র মেনে চলা স্বনির্ভর শিক্ষিত মেয়েরাও অত্যাচারী বা বহুগামী স্বামীর স’ঙ্গে সংসার করছে মুখ বুজে। এ ধ’রনের সমাজে’ বিয়েটা নিতান্তই পুরুষের ক্ষেত্রে অর্জন’ মেয়েদের ক্ষেত্রে বিসর্জন। বিয়ে কাউকে একাকিত্ব থেকে মু’ক্তি দেয়’ কারও পায়ে পরায় নির্ম’ম শেকল।

এখনও সমাজে দেদার বর্বরতা চলে’ চলে জাত বর্ণের হিসাব’ পণের হিসাব’ স্ত্রীকে নিতান্তই যৌ*নসামগ্রী’ ক্রীতদাসী আর সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা’ সন্তান বিশে’ষ করে পুত্র সন্তান জ’ন্ম দেওয়ার চা’প’ কন্যাভ্রুণকে জ’ন্মাতে না দেওয়া’ জ’ন্মালেও পুঁতে ফেলা’ পুত্র না জ’ন্মালে তালাক’ পুনর্বিবাহ। নিয়ম মেনে চলার লোক যেমন প্রচুর আছে’ নিয়ম ভা’ঙার লোকও কিন্তু আছে। মানুষ যত সভ্য হচ্ছে’ বিয়ের পুরনো নিয়মগুলো তত ভে’’ঙে পড়ছে।

সমাজ বদলায় হাতেগোনা কিছু লোক। সমাজে’’র সব লোক দল বেঁধে সমাজ বদলায় না। বেশির ভাগ লোক বরং দল বেঁধে প্রাচীন নীতিরীতি শক্ত করে আঁকড়ে রাখে। বিয়ের পর মেয়েদের চাকরি-বাকরি ব্যবসা-বাণিজ্য চলবে না’ স্বামীর আদেশ নি’ষেধ অমান্য করা চলবে না’ বিধবা বিবাহ চলবে না- এই নিয়মগুলো প্রাচ্যের কিছু সাহসী মেয়ে এখন আর মানে না।

বিয়ের বিবর্তন ঘ’টেছে। বিয়ের উদ্দেশ্য পাল্টেছে’ ধ’রন পাল্টেছে। পাশ্চাত্যে’ যেখানে মেয়েদের স্বাধীন’তা আর অধিকারের সংগ্রাম দীর্ঘকাল চলেছে এবং শে’ষ পর্যন্ত মেয়েরা অনেকটাই সমানাধিকার ভোগ করছে’ সেখানে বিয়েটা এখন আর সন্তানের পিতৃপরিচয়ের নিশ্চয়তার জন্য নয়’ মেয়েদের দিয়ে সংসার আর সন্তান দেখাশোনার কাজ কৌশলে করিয়ে নেওয়া নয়। সন্তান না জ’ন্মালেও ক্ষ’তি নেই। স’স্পর্ক আর সংসার সুখময় করার জন্য যে জিনিসের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন’ তা হলো’ পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা আর শ্রদ্ধাবোধ।

এ দুটো থাকলেই মানুষ পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকে। বিয়ে যদি বিশ্বস্ত রাখতে পারতো’ তাহলে এত পরকীয়া স’স্পর্ক গড়ে উঠতো না। বিয়ে না করে যারা সংসার করছে তাদের মধ্যেও পরস্পরের প্রতি বিশ্বস্ত থাকার একই অলিখিত শর্ত থাকে। সব দম্পতিই যে একগামিতা বা বিশ্বস্ততা চায়’ তা নয়। কিছু স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে ভালোবেসেও একঘেয়েমি দূ’র ক’রতে ভিন্ন নারী ও পুরুষকে নিজেদের সঙ্গী হতে আমন্ত্রণ জা’নায়। কোনও লুকোচু’রি নেই’ নিজেদের শোবার ঘরে’ নিজেদের বি’ছানায়’ দুজনের স’ঙ্গে যোগ হয় এক দুই তিন বা চার বা তারও চেয়ে বেশি।

এই দলবদ্ধ যৌ*নতা দাম্পত্য জী’বনে বৈচিত্র্য আনে’ স’স্পর্ককে তাজা রাখে। কিছু দার্শনিক গুচ্ছ-বিয়েকে বেশ জো’রেশোরে সমর্থন ক’রেছেন। বিয়ের বি’চ্ছেদ না ঘ’টিয়ে সন্তানের সুবিধের কথা ভেবে গুচ্ছ-বিয়ে মেনে নেওয়াই নাকি বুদ্ধিমানের কাজ। গুচ্ছ-বিয়েটা অনেকগুলো নারী পুরুষের সমাহার’ যারা সকলেই সকলের স্ত্রী বা স্বামী। গুচ্ছপ্রেম বা ‘পলিয়ামোরি’ বলেও এক ধ’রনের স’স্পর্ক আছে। একাধিক নারী পুরুষ’ প্রত্যেকে পরস্পরের প্রেমিক বা প্রেমিকা। বহুবিবাহ তো দীর্ঘকাল প্রচলিত ছিলই’ এক স্বামীর বহু স্ত্রী।

আবার আরেক ধ’রনেরও বহুবিবাহও কিছু কিছু সমাজে চলে’ এক স্ত্রীর বহু স্বামী। দুনিয়াতে সব কিছুরই চর্চা হয়েছে’ এখনও হচ্ছে। কিন্তু সব ছাপিয়ে এক-স্বামী-এক-স্ত্রীর বিয়েই এখন পর্যন্ত রাজত্ব করছে। ছরি ঘোরানোটা এই স’স্পর্কে বড় সুবিধে বটে। বিয়েটা মূলত দৈহিক স’স্পর্কের লাইসেন্স। এই লাইসেন্সটাই ঢাকঢোল পি'টিয়ে নেওয়া হয়। নিতান্তই প্রাচীন’ পিতৃতান্ত্রিক’ অযৌক্তিক একটি প্রথা। এই প্রথাটির জীবিত থাকার কোনও কারণ নেই।

অনেক প্রথাই মরে গেছে বা যাচ্ছে’ যেমন সতীদাহ’ যেমন ডাইনি-হ’ত্যা’ যেমন অগুনতি বিয়ে’ আত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে। অর্থহীন অনেক প্রথাই ভ’য় দেখিয়ে’ বোধবুদ্ধির লোপ পাইয়ে দিয়ে চালু রাখা হচ্ছে বটে’ তবে বড় জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথার ব্যবহার না হতে থাকলে’ প্রথা ধীরে ধীরে মরে যেতে বাধ্য।

যেহেতু শতাব্দী ধ’রে প্রমাণ হচ্ছে বিয়ে কোনও নির্ণায়ক বিষয় নয় স’স্পর্ক টেকানোর’ তাই এটিরও ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল নয়। বিবর্তন আমাদের পূর্ব-পুরুষের লেজ খসিয়েছে প্রয়োজন নেই বলে। বিবর্তন আমাদের সমাজ থেকে বিয়ে নামক একটি অপ্রয়োজনীয় সংস্কার দূ’র করবে না’ এ কোনও কথা? এককালের দার্শনিক নিৎসে’ কান্ট’ হেগেল প্রবল নারীবিরো’ধী ছিলেন।

দ’র্শনেরও বিবর্তন ঘ’টেছে’ নারীর প্রতি অমন তীব্র ঘৃণা নিয়ে আজকাল দার্শনিক বনার কোনও উপায় নেই। নারীর প্রতি ঘৃণার কারণে জ’ন্ম নিয়েছে পুরুষতন্ত্র। পুরুষতন্ত্র জ’ন্ম দিয়েছে অনেক নারীবিরো’ধী প্রথা’ এর মধ্যে বিয়ে একটি। পুরুষতন্ত্র যত পরাজিত হবে’ যত পর্যুদস্ত হবে’ নারী যত তার স্বাধীন’তা ফি’রে পাবে’ যত সে আত্মবিশ্বা’সী হবে’ যত সে নারীবিরো’ধী সংস্কারকে সমাজ থেকে ঠেলে সরাতে পারবে’ বর্বরতাকে যত দূ’র ক’রতে পারবে সমাজ’ যত সভ্য হবে সমাজ’ যত সভ্য হবে পুরুষ’ পুরুষতান্ত্রিক প্রথার গায়েও তত মরচে ধ’রবে।

আম’রা এর মধ্যেই দেখছি সভ্য সমাজে বিয়ে কমে যাচ্ছে। কিন্তু একটি সমাজ তো চিরকাল অসভ্য আর অশিক্ষিত থেকে যায় না! সমাজও বিবর্তিত হয়। সমাজ সভ্য হয়েছে কখন বুঝবো? যখন দেখবো নারী আর ধ’র্ষিত হচ্ছে না’ নির্যা’তিত হচ্ছে না’ পুরুষের দাসী বা ক্রীতদাসী বা যৌ*নদাসী কোনওটাই নয় নারী’ তুমুল প্রেমে প’ড়ে একত্র বাস করছে কিন্তু বিয়ে নৈব নৈব চ’ অথবা বিয়ে নামক জিনিসটিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে’ তখন।

বিয়ের বিপক্ষে কথা বলেছেন অনেক নারীবাদী লেখক। আন্দ্রিয়া ডোরকিন তো মনেই ক’রতেন’ বিয়েটা স্রেফ ধ’র্ষণ করার জন্য। আর একজন বেশ চমৎকার বলেছিলেন’ বিয়েটা নিতান্তই ‘ইনটিমেট কলোনাইজেশন’। অনেকেই মনে করেন’ বিয়ের বা’ধাটা দূ’র না হলে মেয়েদের সত্যিকার স্বাধীন’তা অনেকটা অসম্ভব। প্রায় সব নারীবাদীই বিশ্বা’স ক’রতেন’ এখনও অনেকে করেন যে’ পুরুষতন্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য বিয়েটা বেশ অসাধারণ একটা প্রথা।

নারীবাদীদের কেউ কেউ প্রেম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন’ প্রেমটা নাকি একরকম রাজনৈতিক ষড়য’ন্ত্র’ মেয়েরা সেই ষড়য’ন্ত্রের শি’কার হয়ে বিয়ে ক’রতে অর্থাৎ শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ ক’রতে বাধ্য হয়। নারীবাদীদের কাছে বিয়েটা এত আপ’ত্তিকর হতো না’ স্ত্রীর ভূমিকা যদি এমন দাসী-বাঁদির না হতো।

গ্লোরিয়া স্টাইনেমকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম’ ‘এই যে বিয়ের বি’’রুদ্ধে এত গীত গেয়েছো’ শে’ষে নিজেই যে বুড়ো বয়সে একটা বিয়ে করে বসলে’ কারণটা কী?’ গ্লোরিয়া যে ব’’ন্ধুটিকে বিয়ে করেছিলেন’ ওঁর নাকি খুব বড় অসুখ করেছিল’ বিয়ে করলে গ্লোরিয়ার স্বামী হিসেবে স্বা’স্থ্যবীমা পেতে সুবিধে হবে ওঁর’ সে কারণেই বিয়ে। গ্লোরিয়ার জায়গায় আমি হলে ব’’ন্ধুকে সাহায্য করার বিকল্প ব্যব’স্থা নিতাম’ কিন্তু বিয়ে নামক পুরুষতান্ত্রিক ব্যব’স্থার স’ঙ্গে কিছুতেই আপস করতাম না। বিয়ে যে জী’বনে আমি করিনি তা নয়’ করেছি’ তখন করেছি যখন জানতাম না যে বিয়েটা আ’’সলে নারীর ওপর পুরুষের প্রভুত্ব কায়েম করার একটা সামাজিক চুক্তিপত্র ছাড়া কিছু নয়। কেউ কেউ ঘা খাওয়ার আগে শেখে’ কেউ কেউ আবার ঘা খেয়ে শেখে। আমা’র না হয় একটু ঘা খেয়েই শেখা হলো।

কিন্তু শেখা তো হলো। কত কাউকে দিনরাত দেখছি’ কোনও কিছুই যাদের কোনও কিছু শেখাতে পারে না। বিয়ে নামের অপ্রয়োজনীয় একটি প্রথা মরে প’ড়ে থাকবে একদিন। আগামী দিনের সমাজবিজ্ঞানীরা ইতিহাস খুঁড়ে বিয়ের ফসিল আবিষ্কার করবেন’ আলোকিত মানুষকে পুরনো দিনের গল্প শোনাবেন। … ‘পৃথিবীতে একটি যুগ ছিল’ সে যুগের নাম অ’ন্ধকার যুগ। সেই অ’ন্ধকার যুগে একটি প্রথা দীর্ঘকাল টিকে ছিল’ প্রথাটির নাম বিয়ে।’ বিয়েটা কী এবং কেন’ এসব বোঝাতে গিয়ে পুরুষতন্ত্রের প্রসঙ্গ উঠবে’ তখন নিশ্চয়ই ভবিষ্যতের সেই সব মানুষের গা কেঁপে উঠবে বীভৎস একটা সমাজ কল্পনা করে। ইউটোপিয়া? না হয় ইউটোপিয়াই।

জুমবাংলানিউজ